১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ


বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক শাসক যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের উপর একের পর এক নিপীড়নমূলক আচরণ করে তখনই এদেশের জনগণ তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। যার পরিণতি ছিল ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানে ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করলে তাঁর উত্তরসূরী জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। তিনি ঘোষণা করেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করলেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি করে। একপর্যায়ে তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে এবং শেষ পর্যায়ে এদেশের নিরীহ মানুষের উপর আক্রমণ করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুর দখলমুক্ত হয়।
ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে ১৯৭০ সালের ২৬ মার্চ এক বেতার ভাষণে পরবর্তী নির্বাচন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সর্বপ্রকার বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে পুনরায় রাজনৈতিক তৎপরতার অনুমতি দেয়া হয়। পাশাপাশি ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ ও ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা পিছিয়ে ৭ ডিসেম্বর এবং ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। তবে ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হওয়ায় ঐ সব অঞ্চলে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
আইনগত কাঠামো আদেশ
ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ২৮ মার্চ জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে নির্বাচন-সংক্রান্ত আইনগত কাঠামো আদেশ কাঠামোর মূল ধারাগুলো ঘোষণা করেন। সেখানে তিনি মূলত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যসংখ্যা কত হবে, ভোটদানের প্রক্রিয়া কী হবে, কত দিনের মধ্য নির্বাচিত পরিষদ সংবিধান রচনা করবে এবং পাকিস্তানের দুইঅংশের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য বিশেষ কিছু দিক তুলে ধরেন। তাঁর ঘোষণার বিশেষ দিকগুলো ছিল:
১. পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট ভেঙে দিয়ে সাবেক প্রদেশগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। এগুলো ১ জুলাই ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হবে।
২. ১৩ জন মহিলা প্রতিনিধি নিয়ে ৩১৩ আসনের জাতীয় পরিষদ হবে, আর ৬২১ জন সদস্য নিয়ে হবে পাঁচটি প্রাদেশিক পরিষদ।
৩. নির্বাচনে এক ব্যক্তি এক ভোট নীতি গ্রহণ করা হয়। পাকিস্তানের দু’অংশের আইন ও অর্থনীতিবিষয়ক দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্ধারণ করবেন।
৪. ভোটার তালিকা ১৯৭০ সালের জুনের মধ্যে তৈরি হবে।
৫. সংবিধান রচনার জন্য পরিষদের প্রথম অধিবেশন থেকে ১২০ দিনের সময় ধার্য করে দেন। এ সময়ের মধ্যে কাজ সমাধা করতে ব্যর্থ হলে পরিষদ ভেঙ্গে নতুন নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বলা হয়, সংবিধান রচনা এবং সংবিধানকে সত্যায়িতকরণ পর্যন্ত সামরিক শাসন বহাল থাকবে। নির্বাচনের নির্দেশনাবলির পাশাপাশি সংবিধানের ভিত্তি সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আইনগত কাঠামো আদেশের ২০ নং ধারায় সংবিধানের মূল ছয়টি নীতি বেঁধে দেয়া হয়। যথা:
ক. ফেডারেল পদ্ধতির সরকার;
খ. ইসলামি আদর্শ হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি;
গ. প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন;
ঘ. মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে;
ঙ. নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন এলাকার মধ্যকার অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বৈষম্য দূর করতে হবে;
চ. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
ইয়াহিয়া খানের আইনগত কাঠামো আদেশে মূলত সার্বভৌম পার্লামেন্টের বদলে একটি দুর্বল পার্লামেন্টের রূপরেখা দেয়া হয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো এর সমালোচনা করে। তারা এ আদেশের অগণতান্ত্রিক ধারাসমূহ বাদ দেয়ার দাবি জানায়।
 নির্বাচন ব্যবস্থাপনা
১৯৬৯ সালের ২ জুলাই ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা অনুযায়ী পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের বিচারক বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। এ নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক কাজ ছিল একটি সর্বজনীন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা। এ তালিকার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩,১২,১৪,৯৩৫ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ২,৫২,০৬,২৬৩ জন। এ ভোটার তালিকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ১৯৭০ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থী দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেও দলীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এককভাবে নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেন। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো পৃক পৃকভাবে প্রার্থী মনোনীত করে। মোট ৭৮১ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের ছিল ১৬২ জন প্রার্থী এবং তাদের নির্বাচনী প্রতীক ছিল নৌকা। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছিল নিখিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় জমিয়াতুল উলেমা ও নেজামে ইসলামী (৪৫), ইসলামী গণতন্ত্রী দল (৫), জামায়াত-ই-ইসলামী পাকিস্তান (৬৯), পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (৮১), পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন- ৯৩), পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল্লা ৫০), পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাইয়ুম- ৬৫) প্রভৃতি।
 নির্বাচনের ফলাফল
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন লাভ করে। সংরক্ষিত মহিলা আসন সহ আওয়ামী লীগ মোট ১৬৭টি আসন লাভ করে জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আবার পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ মোট ২৯৮টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সে সময় জাতীয় পরিষদের সদস্যদের এমএনএ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের এমপিএ বলা হতো। ভোটের ফলাফল মূল্যায়নে দেখা যায়, মোট প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে ৭৫.১০% এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৭০.৪৮% ভোট পায়। নির্বাচনের এমন ফলাফল পূর্ব পাকিস্তানকে একটি পৃ ক অঞ্চল এবং বাঙালি জাতিকে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় এ দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়া ছিল ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিকশাসক ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি আরম্ভ করে। তিনি ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্ররোচনায় ১ মার্চ স্থগিত ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র, শ্রমিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে জনতা পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করে। সংঘর্ষে বহুলোক নিহত ও আহত হয়। ঐদিন ছাত্রলীগের নেতারা ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন। এ সংগঠনের উদ্যোগে ২ মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। এদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক ছাত্র সমাবেশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৩ মার্চ ছাত্রলীগ পল্টন ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সেখানে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। সমাবেশে ছাত্রলীগ ৫ দফা প্রস্তাব গ্রহণ করে যা স্বাধীনতার ইশতেহার নামে চিহ্নিত করা হয়। এতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ৪ ও ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন অর্ধবেলা হরতাল পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। ছাত্রদের এ ইশতেহারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা আপামর জনসাধারণ সক্রিয়ভাবে হরতাল পালন করে। ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন শিল্পীরা অনুষ্ঠান বর্জন করে। ছাত্র-শিক্ষক, আইনজীবীগণ তাদের কর্মস্থল ত্যাগ করে আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এ তিন দিনের হরতালে ঢাকাসহ সমগ্র দেশের আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে বহু লোক আহত ও নিহত হয়। ইয়াহিয়া খান এ পরিস্থিতিতে ভীতসন্তস্ত্র হয়ে অগত্যা ৬ মার্চ বেতার ভাষণে ঢাকায় ২৫ মার্চ পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। তবে তার ঘোষণা বাংলাদেশের বিক্ষুব্ধ মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সে ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারেননি। ফলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সামরিক শাসনবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনসভার আয়োজন করা হয়।
 নির্বাচনের গুরুত্ব
বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর এটিই ছিল সবচেয়ে বেশি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালি জাতি ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রে যে স্বাতন্ত্র্য দাবি করে আসছিল, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির সেস্বাতন্ত্র্যবাদের বিজয় ঘটে। এছাড়া পূর্বাঞ্চলের জনগণ স্বায়ত্তশাসনের যে দাবি করে আসছি,ল তা পশ্চিমাঞ্চলের সরকার অবৈধ বলে ঘোষণা করে। এ নির্বাচনের ফলাফলে ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির বৈধতা প্রমাণিত হয়। সর্বোপরি ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় আসলে তিনি তা না করে নিরীহ বাঙালির উপর সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেন। শুরু হয় বাংলার মানুষের মুক্তির সশস্ত্র সংগ্রাম, যার পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম নেয়।

Comments

Popular posts from this blog

অখন্ড বাংলা আন্দোলন কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দেশ ও সংগঠনের অবদান

Some famous quotes of Abul Kalam